মরুভূমির ওপর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা গিজার পিরামিড, নিনেভেহর প্রাসাদে খোদাই করা যুদ্ধদৃশ্য, পারস্যের রাজপথ, রোমের আইনব্যবস্থা এবং চীনের সম্রাটের দরবার—সবকিছুর পেছনে ছিল প্রাচীন রাজতন্ত্র। এসব শাসনব্যবস্থা কেবল একজন রাজা বা সম্রাটের ব্যক্তিগত ক্ষমতার গল্প নয়; এগুলো ছিল ধর্মীয় বৈধতা, বংশানুক্রম, সামরিক শক্তি, করব্যবস্থা, আইন ও আমলাতন্ত্রের সমন্বিত কাঠামো।

তুলনামূলক ইতিহাসবিদদের মতে, পরবর্তী সাম্রাজ্য এবং আধুনিক রাষ্ট্রের বহু প্রশাসনিক ধারণার ভিত্তি এসব প্রাচীন ব্যবস্থার মধ্যেই গড়ে ওঠে (ফাইনার, ১৯৯৭; মরিস ও শাইডেল, ২০০৯)। এই নিবন্ধে মিশর, আসিরিয়া, পারস্য, ম্যাসিডোনিয়া, রোম, বাইজান্টিয়াম, মৌর্য, গুপ্ত, ছিন, হান, হিত্তিত, সেলিউসিড ও টলেমীয় শাসনের বৈশিষ্ট্য এবং দীর্ঘমেয়াদি উত্তরাধিকার বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

নিচে মূল নম্বর, শিরোনাম ও পৃথক বিভাগ অক্ষুণ্ণ রেখে বাংলা অনুবাদ দেওয়া হলো।

১.০ প্রধান প্রাচীন রাজতন্ত্রসমূহের তালিকা

প্রাচীন সাম্রাজ্য ও রাজতন্ত্রবিষয়ক তুলনামূলক গবেষণার আলোকে (ফাইনার, ১৯৯৭; মরিস ও শাইডেল, ২০০৯; ব্যাং ও কলোজিয়েচিক, ২০১২), নিচের রাজতন্ত্রগুলোকে ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন রাজতন্ত্রগুলোর অন্তর্ভুক্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়:

১.১ নিকটপ্রাচ্য ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল

১. মিশরের প্রাচীন রাজ্য (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৬৮৬–২১৮১) — পবিত্র ফারাওভিত্তিক রাজতন্ত্র।

২. নব্য-আসিরীয় সাম্রাজ্য (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৯১১–৬০৯) — সামরিকীকৃত সাম্রাজ্যিক রাজতন্ত্র।

৩. আকেমেনীয় পারস্য সাম্রাজ্য (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০–৩৩০) — সাত্রাপভিত্তিক শাসনব্যবস্থা এবং সর্বজনীন রাজকীয় কর্তৃত্ব।

৪. ম্যাসিডোনিয়ার আরগিয়াড রাজবংশ (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৭০০–৩০৯) — পবিত্র রাজতন্ত্র; আলেকজান্ডারের অধীনে সাম্রাজ্যিক বিস্তার।

৫. রোমান সাম্রাজ্য (খ্রিস্টপূর্ব ২৭–খ্রিস্টাব্দ ৪৭৬ / খ্রিস্টাব্দ ১৪৫৩) — আইনগত ও আমলাতান্ত্রিক ভিত্তিসম্পন্ন সাম্রাজ্যিক রাজতন্ত্র।

৬. বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য (খ্রিস্টাব্দ ৩৩০–১৪৫৩) — রোমান সাম্রাজ্যিক রাজতন্ত্রের খ্রিস্টীয় ধারাবাহিকতা।

১.২ দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া

৭. মৌর্য সাম্রাজ্য (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩২২–১৮৫) — অশোকের অধীনে কেন্দ্রীভূত প্রশাসন।

৮. গুপ্ত সাম্রাজ্য (আনুমানিক খ্রিস্টাব্দ ৩২০–৫৫০) — ধ্রুপদি হিন্দু রাজতন্ত্র।

১.৩ পূর্ব এশিয়া

৯. ছিন রাজবংশ (খ্রিস্টপূর্ব ২২১–২০৬) — আইনবাদী কেন্দ্রীকরণ এবং সাম্রাজ্যিক একীকরণ।

১০. হান রাজবংশ (খ্রিস্টপূর্ব ২০৬–খ্রিস্টাব্দ ২২০) — কনফুসীয় আমলাতান্ত্রিক রাজতন্ত্র।

১.৪ অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রাজতন্ত্র

১১. হিত্তিত সাম্রাজ্য (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৬০০–১১৭৮)

১২. সেলিউসিড সাম্রাজ্য (খ্রিস্টপূর্ব ৩১২–৬৩)

১৩. টলেমীয় রাজবংশ—মিশর (খ্রিস্টপূর্ব ৩০৫–৩০)

এই রাজতন্ত্রগুলোর সাধারণ বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ছিল স্বর্গীয় বা পবিত্র কর্তৃত্ব, বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকার, সামরিক নিয়ন্ত্রণ এবং কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থা। এসব বৈশিষ্ট্য পরবর্তী যুগের সাম্রাজ্যিক শাসনব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল।

২.০ প্রধান প্রাচীন রাজতন্ত্রসমূহের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

২.১ মিশরের প্রাচীন রাজ্য (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৬৮৬–২১৮১) — পবিত্র ফারাওভিত্তিক রাজতন্ত্র

মিশরে ফারাওদের জীবন্ত দেবতা বলে মনে করা হতো। তাঁর প্রধান দায়িত্ব ছিল মা’আত, অর্থাৎ শৃঙ্খলা, ন্যায় এবং মহাজাগতিক ভারসাম্য রক্ষা করা।

গিজার পিরামিড শুধু সমাধিসৌধ ছিল না; এগুলো ছিল রাজকীয় সম্পদ, শ্রমসংগঠন এবং ধর্মীয় বৈধতার দৃশ্যমান ঘোষণা। কর আদায়, সেচব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ এবং লিপিকরদের মাধ্যমে নথি সংরক্ষণ এই প্রাচীন রাজতন্ত্রকে দীর্ঘস্থায়ী করেছিল (ফাইনার, ১৯৯৭)।

২.২ নব্য-আসিরীয় সাম্রাজ্য (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৯১১–৬০৯) — সামরিকীকৃত সাম্রাজ্যিক রাজতন্ত্র

আসিরীয় শাসকেরা দেবতা আশুরের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করতেন। তাঁদের শক্তির ভিত্তি ছিল স্থায়ী সেনাবাহিনী, লৌহাস্ত্র, অশ্বারোহী বাহিনী, অবরোধকৌশল এবং প্রাদেশিক প্রশাসন

বিজিত অঞ্চল থেকে কর ও সৈন্য সংগ্রহ করা হতো। সড়ক ও বার্তাব্যবস্থা কেন্দ্রের নির্দেশ দ্রুত প্রদেশগুলোতে পৌঁছে দিত। এভাবে সামরিক ভীতি এবং প্রশাসনিক দক্ষতা একই সঙ্গে কাজ করত (মরিস ও শাইডেল, ২০০৯; ওয়াসমুথ প্রমুখ, ২০২৫)।

২.৩ আকেমেনীয় পারস্য সাম্রাজ্য (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০–৩৩০) — সাত্রাপভিত্তিক শাসনব্যবস্থা এবং সর্বজনীন রাজকীয় কর্তৃত্ব

মহান সাইরাস প্রতিষ্ঠিত পারস্য সাম্রাজ্য বহু ভাষা, ধর্ম ও জনগোষ্ঠীকে শাসন করেছিল। সম্রাটের উপাধি ছিল রাজাদের রাজা। বিশাল ভূখণ্ডকে সাত্রাপি বা প্রদেশে ভাগ করা হয়েছিল।

সাত্রাপরা প্রাদেশিক শাসন পরিচালনা করলেও রাজকীয় পর্যবেক্ষক, সেনাবাহিনী ও করব্যবস্থা কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখত। মানসম্মত মুদ্রা, রাজপথ এবং স্থানীয় ধর্মের প্রতি সহনশীলতা পারস্যের স্থিতিশীলতা বাড়ায়। এই প্রাচীন রাজতন্ত্র পরবর্তী রোমান ও বাইজান্টাইন সর্বজনীন সম্রাটের ধারণাকে প্রভাবিত করেছিল (ব্যাং ও কলোজিয়েচিক, ২০১২)।

২.৪ ম্যাসিডোনিয়ার আরগিয়াড রাজবংশ (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৭০০–৩০৯) — পবিত্র রাজতন্ত্র; আলেকজান্ডারের অধীনে সাম্রাজ্যিক বিস্তার

আরগিয়াড রাজারা নিজেদের বীর হেরাক্লেসের বংশধর বলে দাবি করতেন। দ্বিতীয় ফিলিপ সেনাবাহিনীকে পেশাদার করেন এবং ম্যাসিডোনীয় ফ্যালাঙ্কস উন্নত করেন (অ্যানসন, ২০২০)।

তৃতীয় আলেকজান্ডার গ্রিস থেকে ভারত পর্যন্ত সাম্রাজ্য বিস্তার করেন। পারস্যের দরবারি রীতি গ্রহণের মাধ্যমে তিনি গ্রিক ও প্রাচ্য রাজকীয় ঐতিহ্যের সংমিশ্রণ ঘটান (বসওয়ার্থ, ২০০২)। ফলে ম্যাসিডোনীয় শাসন প্রাচীন গ্রিক রাজতন্ত্র এবং পরবর্তী হেলেনীয় সাম্রাজ্যের মধ্যে সেতু হয়ে ওঠে।

২.৫ রোমান সাম্রাজ্য (খ্রিস্টপূর্ব ২৭–খ্রিস্টাব্দ ৪৭৬ / খ্রিস্টাব্দ ১৪৫৩) — আইনগত ও আমলাতান্ত্রিক ভিত্তিসম্পন্ন সাম্রাজ্যিক রাজতন্ত্র

রোম প্রজাতন্ত্র হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও অগাস্টাসের অধীনে খ্রিস্টপূর্ব ২৭ সালে কার্যত সাম্রাজ্যিক রাজতন্ত্রে রূপ নেয়। সম্রাট সেনাবাহিনী, আইন, কর এবং প্রাদেশিক প্রশাসনের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক ছিলেন।

রোমান আইন, সড়ক, জলাধার, নগরব্যবস্থা এবং পেশাদার সেনাবাহিনী সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলকে সংযুক্ত রাখে। প্রাদেশিক জনগণকে ধীরে ধীরে নাগরিকত্ব দেওয়ায় রাজনৈতিক আনুগত্য বৃদ্ধি পায়। এ বৈশিষ্ট্য রোমকে অনেক কঠোর জাতিগত সাম্রাজ্য থেকে আলাদা করেছিল (বারব্যাঙ্ক ও কুপার, ২০১০)।

২.৬ বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য (খ্রিস্টাব্দ ৩৩০–১৪৫৩) — রোমান সাম্রাজ্যিক রাজতন্ত্রের খ্রিস্টীয় ধারাবাহিকতা

বাইজান্টিয়াম ছিল পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের ধারাবাহিকতা। এখানে সম্রাটকে পৃথিবীতে ঈশ্বরের প্রতিনিধি বলে বিবেচনা করা হতো। রোমান আইন, গ্রিক প্রশাসনিক সংস্কৃতি এবং অর্থডক্স খ্রিস্টধর্ম মিলিয়ে একটি দীর্ঘস্থায়ী শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠে।

জাস্টিনিয়ানের আইনসংকলন পরবর্তী ইউরোপীয় আইনচর্চায় গভীর প্রভাব ফেলে। এই প্রাচীন রাজতন্ত্র দেখায়, ধর্মীয় মতাদর্শ পরিবর্তিত হলেও কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামো শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে থাকতে পারে।

২. মৌর্য সাম্রাজ্য (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩২২–১৮৫) — অশোকের অধীনে কেন্দ্রীভূত প্রশাসন

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্য অশোকের সময় সর্বোচ্চ বিস্তার লাভ করে। প্রাদেশিক গভর্নর, কর কর্মকর্তা, গুপ্তচর এবং রাজকীয় দূত কেন্দ্রের কর্তৃত্ব বজায় রাখত।

কলিঙ্গ যুদ্ধের পর অশোক ধম্ম, ধর্মীয় সহনশীলতা, প্রাণীর সুরক্ষা এবং জনকল্যাণকে রাজনীতির ভাষায় রূপ দেন। শিলালিপি ও স্তম্ভলিপির মাধ্যমে তাঁর নির্দেশ সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো হতো। তাই মৌর্য শাসন ক্ষমতা, সামরিক অর্থায়ন এবং নৈতিক কর্তব্যের যুগপৎ উদাহরণ (মরিস ও শাইডেল, ২০০৯; রায়, ২০২২)।

২.৮ গুপ্ত সাম্রাজ্য (আনুমানিক খ্রিস্টাব্দ ৩২০–৫৫০) — ধ্রুপদি হিন্দু রাজতন্ত্র

খ্রিস্টীয় চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শতকের গুপ্ত শাসনকে প্রায়ই ভারতীয় সংস্কৃতির স্বর্ণযুগ বলা হয়। রাজারা হিন্দু ধর্মীয় বৈধতা গ্রহণ করলেও বৌদ্ধ ও জৈন প্রতিষ্ঠানও টিকে ছিল।

সাহিত্য, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং শিল্পকলায় রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা শাসকদের মর্যাদা বাড়ায়। মৌর্যদের তুলনায় প্রশাসন কম কেন্দ্রীভূত ছিল এবং স্থানীয় শাসক ও ভূমিদাতাদের ভূমিকা ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি।

২.৯ ছিন রাজবংশ (খ্রিস্টপূর্ব ২২১–২০৬) — আইনবাদী কেন্দ্রীকরণ এবং সাম্রাজ্যিক একীকরণ

খ্রিস্টপূর্ব ২২১ সালে ছিন শি হুয়াং প্রতিদ্বন্দ্বী রাজ্যগুলোকে একত্র করে চীনকে রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করেন। তিনি সামন্তীয় ক্ষমতা ভেঙে প্রদেশ ও জেলাভিত্তিক প্রশাসন চালু করেন।

ওজন, পরিমাপ, মুদ্রা, লিপি, গাড়ির অক্ষের প্রস্থ এবং সড়কব্যবস্থা মানসম্মত করা হয়। কঠোর আইন ও বাধ্যতামূলক শ্রম অসন্তোষ সৃষ্টি করলেও এই প্রাচীন রাজতন্ত্র পরবর্তী চীনা সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক নকশা তৈরি করে দেয় (মরিস ও শাইডেল, ২০০৯; এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, তারিখবিহীন-ক)।

২.১০ হান রাজবংশ (খ্রিস্টপূর্ব ২০৬–খ্রিস্টাব্দ ২২০) — কনফুসীয় আমলাতান্ত্রিক রাজতন্ত্র

হান শাসকেরা ছিনের কেন্দ্রীভূত কাঠামো বজায় রেখে কনফুসীয় নীতি ও শিক্ষিত আমলাদের গুরুত্ব বাড়ান। সম্রাটকে স্বর্গপুত্র বলা হতো এবং তাঁর বৈধতা ন্যায়পরায়ণ শাসনের ওপর নির্ভরশীল বলে মনে করা হতো।

কর, জনগণনা, রাজকীয় ইতিহাসলেখন এবং সিল্ক রোডের বাণিজ্য সাম্রাজ্যকে শক্তিশালী করে। এই ব্যবস্থা পূর্ব এশিয়ার রাজনীতি, শিক্ষা এবং আমলাতন্ত্রে শতাব্দীর পর শতাব্দী প্রভাব রেখেছে (এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, তারিখবিহীন-খ)।

২.১১ হিত্তিত সাম্রাজ্য (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৬০০–১১৭৮)

আনাতোলিয়াকেন্দ্রিক হিত্তিত সম্রাট ছিলেন প্রধান সেনানায়ক ও প্রধান পুরোহিত। তবে অভিজাত পরিষদও কিছু রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করত। ফলে শাসনব্যবস্থা পুরোপুরি একমুখী ছিল না।

মিশরের সঙ্গে সম্পাদিত কাদেশের সন্ধি প্রাচীন বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত শান্তিচুক্তি। এটি হিত্তিতদের উন্নত কূটনীতি, পারস্পরিক নিরাপত্তা এবং আইনি প্রথার পরিচয় দেয় (ব্রাইস, ২০০৫)।

২.১২ সেলিউসিড সাম্রাজ্য (খ্রিস্টপূর্ব ৩১২–৬৩)

আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর প্রথম সেলিউকাস আনাতোলিয়া থেকে পারস্য পর্যন্ত বিস্তৃত সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। শাসকেরা ম্যাসিডোনীয় সামরিক ঐতিহ্য, গ্রিক নগরসংস্কৃতি এবং পারস্যের প্রশাসনিক পদ্ধতি একত্র করেছিলেন।

অ্যান্টিওক ও সেলিউসিয়ার মতো নগর ছিল কর, বাণিজ্য এবং রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এই প্রাচীন রাজতন্ত্র ছিল সংকর শাসনব্যবস্থার উজ্জ্বল উদাহরণ (কসমিন, ২০১৪)।

২.১৩ টলেমীয় রাজবংশ—মিশর (খ্রিস্টপূর্ব ৩০৫–৩০)

গ্রিক বংশোদ্ভূত টলেমীয়রা মিশর শাসন করতে গিয়ে ফারাওয়ের উপাধি, পোশাক এবং ধর্মীয় আচার গ্রহণ করেন। নতুন দেবতা সেরাপিস গ্রিক ও মিশরীয় ধর্মীয় উপাদানের মিলন ঘটায়।

রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত জমি, শস্য এবং বাণিজ্যিক একচেটিয়া ব্যবস্থা রাজকোষ সমৃদ্ধ করে (ম্যানিং, ২০১০)। বিদেশি শাসকেরা কীভাবে স্থানীয় সংস্কৃতি ও ধর্মের সাহায্যে বৈধতা অর্জন করতে পারে, টলেমীয় শাসন তার স্পষ্ট উদাহরণ।

৩.০ প্রাচীন রাজতন্ত্রসমূহের তুলনামূলক বৈশিষ্ট্য

বিভিন্ন অঞ্চলের পার্থক্য সত্ত্বেও পাঁচটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। প্রথমত, দেবীয় বা পবিত্র কর্তৃত্ব—যেমন ফারাও, রাজাদের রাজা, সম্রাট-পূজা কিংবা স্বর্গপুত্র। দ্বিতীয়ত, বংশানুক্রমিক বৈধতা। তৃতীয়ত, রাজকীয় নিয়ন্ত্রণাধীন সেনাবাহিনী। চতুর্থত, কর, আইন, নথি এবং প্রদেশভিত্তিক আমলাতন্ত্র। পঞ্চমত, সর্বজনীন শাসন বা নৈতিক অভিভাবকত্বের সাম্রাজ্যিক দাবি।

তবে প্রাচীন রাজতন্ত্র কখনোই স্থির বা অপরিবর্তনীয় ছিল না। বিদ্রোহ, অর্থনৈতিক চাপ, ধর্মীয় পরিবর্তন, উত্তরাধিকারসংকট এবং নতুন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে এসব ব্যবস্থাকে নিয়মিত মানিয়ে নিতে হতো (গোল্ডস্টোন ও হ্যালডন, ২০০৯)।

প্রাচীন রাজতন্ত্রসমূহ মানবসভ্যতার প্রথম বৃহৎ রাজনৈতিক পরীক্ষাগারগুলোর একটি। মিশর ধর্মীয় প্রতীককে প্রশাসনিক শক্তিতে রূপ দিয়েছিল; আসিরিয়া সামরিক সংগঠনকে সাম্রাজ্য বিস্তারের হাতিয়ার করেছিল; পারস্য বৈচিত্র্যের মধ্যে প্রাদেশিক শাসন গড়েছিল; রোম আইন ও নাগরিকত্ব ব্যবহার করেছিল; আর মৌর্য ও হান নৈতিকতা ও আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে সম্রাটের কর্তৃত্ব দৃঢ় করেছিল।

তাই রাজতন্ত্রকে শুধু স্বৈরশাসন হিসেবে দেখলে এর পূর্ণ জটিলতা বোঝা যায় না। এসব ব্যবস্থার মধ্যেই আধুনিক রাষ্ট্রের করব্যবস্থা, আইন, অবকাঠামো, প্রশাসন, কূটনীতি এবং রাজনৈতিক বৈধতার বহু পূর্বসূত্র নিহিত রয়েছে।

তথ্যসূত্র

অ্যানসন, ই. এম. (২০২০) ফিলিপ দ্য সেকেন্ড: দ্য ফাদার অব আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট—থিমস অ্যান্ড ইস্যুজ। লন্ডন: ব্লুমসবারি অ্যাকাডেমিক। https://books.google.com/books?q=Philip+II+The+Father+of+Alexander+the+Great+Anson

ব্যাং, পি. এফ. ও কলোজিয়েচিক, ডি. (সম্পা.) (২০১২) ইউনিভার্সাল এম্পায়ার: আ কমপারেটিভ অ্যাপ্রোচ টু ইম্পেরিয়াল কালচার অ্যান্ড রিপ্রেজেন্টেশন ইন ইউরেশিয়ান হিস্ট্রি। কেমব্রিজ: কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস। https://books.google.com/books?q=Universal+Empire+Bang+Kolodziejczyk

বারব্যাঙ্ক, জে. ও কুপার, এফ. (২০১০) এম্পায়ার্স ইন ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি: পাওয়ার অ্যান্ড দ্য পলিটিকস অব ডিফারেন্স। প্রিন্সটন: প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস। https://books.google.com/books?q=Empires+in+World+History+Burbank+Cooper

বসওয়ার্থ, এ. বি. (২০০২) দ্য লেগাসি অব আলেকজান্ডার: পলিটিকস, ওয়ারফেয়ার অ্যান্ড প্রোপাগান্ডা আন্ডার দ্য সাকসেসরস। অক্সফোর্ড: অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস। https://books.google.com/books?q=The+Legacy+of+Alexander+Bosworth

ব্রাইস, টি. (২০০৫) দ্য কিংডম অব দ্য হিত্তিতস, দ্বিতীয় সংস্করণ। অক্সফোর্ড: অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস। https://books.google.com/books?q=The+Kingdom+of+the+Hittites+Bryce

এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা (তারিখবিহীন-ক) ‘ছিন ডাইনাস্টি’। https://www.britannica.com/topic/Qin-dynasty

এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা (তারিখবিহীন-খ) ‘হান ডাইনাস্টি’। https://www.britannica.com/topic/Han-dynasty

ফাইনার, এস. ই. (১৯৯৭) দ্য হিস্ট্রি অব গভর্নমেন্ট ফ্রম দ্য আর্লিয়েস্ট টাইমস। অক্সফোর্ড: অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস। https://books.google.com/books?q=The+History+of+Government+from+the+Earliest+Times+Finer

গোল্ডস্টোন, জে. এ. ও হ্যালডন, জে. এফ. (২০০৯) ‘এনশিয়েন্ট স্টেটস, এম্পায়ার্স অ্যান্ড এক্সপ্লয়টেশন: প্রবলেমস অ্যান্ড পার্সপেকটিভস’, ইন মরিস, আই. ও শাইডেল, ডব্লিউ. (সম্পা.) দ্য ডায়নামিকস অব এনশিয়েন্ট এম্পায়ার্স। নিউ ইয়র্ক: অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস। https://books.google.com/books?q=Ancient+States+Empires+and+Exploitation+Goldstone+Haldon

কসমিন, পি. জে. (২০১৪) দ্য ল্যান্ড অব দ্য এলিফ্যান্ট কিংস: স্পেস, টেরিটরি অ্যান্ড আইডিওলজি ইন দ্য সেলিউসিড এম্পায়ার। কেমব্রিজ, ম্যাসাচুসেটস: হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস। https://books.google.com/books?q=The+Land+of+the+Elephant+Kings+Kosmin

ম্যানিং, জে. জি. (২০১০) দ্য লাস্ট ফারাওস: ইজিপ্ট আন্ডার দ্য টলেমিস, ৩০৫–৩০ বিসিই। প্রিন্সটন: প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস। https://books.google.com/books?q=The+Last+Pharaohs+Manning

মরিস, আই. ও শাইডেল, ডব্লিউ. (সম্পা.) (২০০৯) দ্য ডায়নামিকস অব এনশিয়েন্ট এম্পায়ার্স: স্টেট পাওয়ার ফ্রম আসিরিয়া টু বাইজান্টিয়াম। নিউ ইয়র্ক: অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস। https://books.google.com/books?q=The+Dynamics+of+Ancient+Empires+Morris+Scheidel

রায়, কে. (২০২২) ‘ফাইন্যান্সিং ওয়ারফেয়ার ইন এনশিয়েন্ট ইন্ডিয়া: ১৫০০ বিসিই–সার্কা ৮০০ সিই’, ইন্টারন্যাশনাল এরিয়া স্টাডিজ রিভিউhttps://doi.org/10.1177/22338659221108954

ওয়াসমুথ, এম. প্রমুখ (২০২৫) ‘কিংশিপ অ্যান্ড কুইনশিপ ইন দ্য এনশিয়েন্ট নিয়ার ইস্টার্ন এম্পায়ার্স অব দ্য ফার্স্ট মিলেনিয়াম বিসিই: দ্য ইকোনমিক বেসিস’, এনকি অ্যান্ড প্তাহ: জার্নাল অব আর্কিওলজি অ্যান্ড অ্যানশিয়েন্ট হিস্ট্রি। https://riviste.unimi.it/index.php/enkiandptah/article/view/23131