স্ট্যাচু অব লিবার্টির ইতিহাস: লেডি লিবার্টির বিস্ময়কর জীবনী ও প্রতীকগুলোর গোপন অর্থ

9 minutes read

নিউইয়র্ক হারবারের প্রবেশমুখে সমুদ্রের ওপর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এক তামার নারী-মূর্তি। আকাশের দিকে উঁচু করে ধরা তার মশাল, মাথায় সাত রশ্মির মুকুট, আর দূরে বিস্তৃত ম্যানহাটানের দৃশ্য—সব মিলিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত স্থাপত্য-প্রতীকগুলোর একটি এটি। কিন্তু স্ট্যাচু অব লিবার্টির ইতিহাস শুধু পর্যটকদের দেখা পরিচিত দৃশ্য বা পোস্টকার্ডের গল্প নয়।

এর আনুষ্ঠানিক নাম লিবার্টি এনলাইটেনিং দ্য ওয়ার্ল্ড। একটি ফরাসি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ধারণা থেকে শুরু হয়ে এটি অসাধারণ এক প্রকৌশল প্রকল্পে রূপ নেয়; শত শত খণ্ডে আটলান্টিক পাড়ি দেয় এবং শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে  স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, অভিবাসন, মুক্তি ও আশার আন্তর্জাতিক প্রতীক

মূর্তিটির সাত রশ্মির মুকুট, উঁচু মশাল, তারিখ খোদাই করা ফলক এবং পায়ের কাছে ভাঙা শিকল—কোনোটিই নিছক অলংকার নয়। প্রতিটি উপাদান স্বাধীনতা ও আলোকপ্রাপ্তির একটি বিশেষ বার্তা বহন করে (বেরেনসন, ২০১২; খান, ২০১০)।

১.০ স্ট্যাচু অব লিবার্টির ইতিহাসের সূচনা ফ্রান্সে

স্ট্যাচু অব লিবার্টির ইতিহাস শুরু হয় আমেরিকার গৃহযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে ফ্রান্সে।

এই ধারণার সঙ্গে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন ফরাসি আইনজ্ঞ, দাসপ্রথাবিরোধী চিন্তাবিদ এবং মার্কিন প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থার সমর্থক এদুয়ার রেনে দ্য লাবুলায়ে। ১৮৬০-এর দশকে তিনি এমন একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা তুলে ধরেন, যা স্বাধীনতার আদর্শ উদ্‌যাপন করবে এবং ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বকে আরও দৃঢ় করবে (খান, ২০১০)।

পরবর্তীকালে ভাস্কর ফ্রেদেরিক অগুস্ত বার্তোলদি সেই ধারণাকে বাস্তব নকশায় রূপ দেন।

১৮৭১ সালে বার্তোলদি যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। নিউইয়র্ক হারবারের বেডলোস আইল্যান্ড—যেটি পরে লিবার্টি আইল্যান্ড নামে পরিচিত হয়—তাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। আটলান্টিক থেকে নিউইয়র্কে প্রবেশ করা জাহাজগুলোর সামনে এই অবস্থানটি ছিল অত্যন্ত দৃশ্যমান (বেরেনসন, ২০১২)।

প্রকল্পটি ছিল আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এক অনন্য উদাহরণ: ফ্রান্স মূর্তিটি নির্মাণ করবে এবং যুক্তরাষ্ট্র নির্মাণ করবে এর বিশাল ভিত্তি বা পেডেস্টাল।

২.০ লেডি লিবার্টির নকশা

বার্তোলদি স্বাধীনতাকে উপস্থাপন করেন বিশাল আকৃতির এক নারীমূর্তি হিসেবে, যার পরনে ছিল ধ্রুপদি ঢঙের প্রবহমান পোশাক।

প্রাচীন শিল্পকলায় ন্যায়বিচার, বিজয় ও স্বাধীনতার মতো বিমূর্ত ধারণাকে মানবমূর্তির মাধ্যমে প্রকাশ করার দীর্ঘ ঐতিহ্য ছিল। লেডি লিবার্টির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্ক রয়েছে লিবার্টাসের, যিনি প্রাচীন রোমে স্বাধীনতার প্রতীকী নারী-রূপ ছিলেন।

বার্তোলদি কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক নারীর প্রতিকৃতি নির্মাণ করেননি। বরং মূর্তিটি একটি মহান ধারণাকে ব্যক্তিরূপ দিয়েছে। এখানে স্বাধীনতাকে দেখানো হয়েছে মর্যাদাপূর্ণ, বিশ্বজনীন এবং সক্রিয় শক্তি হিসেবে।

৩.০ স্ট্যাচু অব লিবার্টির ইতিহাস ও এর প্রতীকগুলোর অর্থ

৩.১ সাত রশ্মির মুকুট

লেডি লিবার্টির সবচেয়ে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো তার মাথার সাতটি বিশাল রশ্মিযুক্ত মুকুট

রশ্মিগুলো এমন এক দৃশ্য তৈরি করে, যেন স্বাধীন লেডি লিবার্টির মাথা থেকে আলো সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ছে। এটি মূর্তিটির আনুষ্ঠানিক নাম লিবার্টি এনলাইটেনিং দ্য ওয়ার্ল্ড ধারণাটিকেও শক্তিশালী করে।

সাতটি রশ্মিকে সাধারণভাবে সাত মহাদেশ ও সাত সমুদ্রের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। অর্থাৎ স্বাধীনতা শুধু কোনো একটি দেশের সম্পদ নয়; এর আবেদন বিশ্বজনীন। মুকুটটি একই সঙ্গে সূর্যরশ্মি বা আলোকোজ্জ্বল মুকুটের শিল্প-ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত, যা জ্ঞান ও আলোকপ্রাপ্তির ইঙ্গিত বহন করে (বেরেনসন, ২০১২; দুরান্তে, ২০০৭)।

মুকুটে আরও রয়েছে ২৫টি জানালা

৩.২ মশাল: স্বাধীনতার আলো

উঁচু করে ধরা মশাল সম্ভবত মূর্তিটির সবচেয়ে পরিচিত প্রতীক।

মশাল বোঝায় আলোকপ্রাপ্তি, জ্ঞান এবং স্বাধীনতার পথপ্রদর্শক শক্তি। মূর্তিটির ফরাসি নামের মধ্যেও এই অর্থ নিহিত—স্বাধীনতা পৃথিবীকে আলোকিত করছে।

বার্তোলদির নির্বাচিত প্রতীকের তাৎপর্য এখানেই। লেডি লিবার্টির হাতে কোনো তলোয়ার বা যুদ্ধাস্ত্র নেই; আছে আলো। ফলে বার্তাটি বিজয় বা সামরিক শক্তির পরিবর্তে জ্ঞান, রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও মানবিক অগ্রগতির সঙ্গে যুক্ত।

বর্তমানে শিক্ষা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও মুক্তির বিভিন্ন প্রচারেও মশালের এই প্রতীক ব্যবহৃত হয়।

৩.৩ ফলক এবং ৪ জুলাই ১৭৭৬

বাম হাতে লেডি লিবার্টি ধরে আছেন একটি বড় ফলক, যাকে বলা হয় টাবুলা আনসাটা

সেখানে রোমান সংখ্যায় লেখা আছে জুলাই চার, এমডিসিসিএলএক্সএক্সভিআই, অর্থাৎ ৪ জুলাই ১৭৭৬—মার্কিন স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র গৃহীত হওয়ার ঐতিহাসিক তারিখ।

ফলকটি তাই বিশ্বজনীন স্বাধীনতার ধারণাকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করেছে। পাশাপাশি এটি আইন, লিখিত নীতি ও নাগরিক শৃঙ্খলার প্রতীক। অর্থাৎ স্বাধীনতা শুধু আবেগ নয়; ঘোষণাপত্র, আইন ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও তা বাস্তব রূপ পায় (বেরেনসন, ২০১২)।

৩.৪ ভাঙা শিকল ও বেড়ি

মূর্তিটির অন্যতম শক্তিশালী প্রতীকটি নিচ থেকে সহজে চোখে পড়ে না।

লেডি লিবার্টির পায়ের কাছে রয়েছে ভাঙা বেড়ি ও শিকল

এগুলো দাসত্ব, অত্যাচার, নিপীড়ন ও পরাধীনতা থেকে মুক্তির প্রতীক। এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব আরও বেশি, কারণ লাবুলায়ে নিজে দাসপ্রথাবিরোধী ছিলেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে দাসপ্রথা বিলোপের সময়ের কাছাকাছি এই স্মৃতিস্তম্ভের ধারণা গড়ে ওঠে (ব্যাবকক, ১৯৮৭; ব্লামবার্গ, ১৯৮৫)।

লেডি লিবার্টিকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে দেখা যায়। এই ভঙ্গি যেন ঘোষণা করে—স্বাধীনতা ভাঙা শিকল পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে চলে।

৩.৫ ধ্রুপদি পোশাক

লেডি লিবার্টির পোশাকও তার প্রতীকী অর্থকে শক্তিশালী করে।

উনিশ শতকের ফরাসি বা মার্কিন পোশাকের পরিবর্তে তাকে প্রাচীন ধ্রুপদি পোশাকে উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে মূর্তিটি নির্দিষ্ট কোনো যুগের মানুষের পরিবর্তে চিরন্তন এক ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

তিনি কোনো শাসক বা রাজনৈতিক নেত্রী নন; তিনি স্বাধীনতার ব্যক্তিরূপ

৪.০ স্ট্যাচু অব লিবার্টির প্রকৌশল

স্ট্যাচু অব লিবার্টির ইতিহাস শুধু শিল্পের নয়, অসাধারণ প্রকৌশলেরও ইতিহাস।

মূর্তিটি কঠিন তামার বিশাল খণ্ড দিয়ে তৈরি নয়। এর বাইরের আবরণ তুলনামূলক পাতলা তামার পাত, যা বিশেষ পদ্ধতিতে আকার দেওয়া হয় এবং ভেতরের কাঠামোর সাহায্যে ধরে রাখা হয়।

প্রথম দিকে স্থপতি ইউজেন ভিওলে-ল্য-দ্যুক প্রকৌশল পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার মৃত্যুর পর প্রকৌশলী গুস্তাভ আইফেল অভ্যন্তরীণ কাঠামো তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।

আইফেল ও তার দল এমন একটি লোহার কাঠামো তৈরি করেন, যা তামার আবরণকে ধরে রাখার পাশাপাশি বাতাস এবং তাপমাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে সামান্য নড়াচড়ার সুযোগ দেয় (খান, ২০১০)।

মূর্তিটি ফ্রান্সে ১৮৮৪ সালে সম্পন্ন হয়।

৫.০ আটলান্টিক পাড়ি ও ভিত্তি বা পেডেস্টাল নির্মাণ

ফ্রান্সে মূর্তি সম্পূর্ণ হলেও নিউইয়র্কে স্থাপন করার কাজ তখনও শেষ হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রে স্থপতি রিচার্ড মরিস হান্টের নকশা করা ভিত্তি বা পেডেস্টাল নির্মাণের জন্য অর্থ সংগ্রহে সমস্যা দেখা দেয়। একসময় অর্থের অভাবে পুরো প্রকল্পই অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।

সংবাদপত্র প্রকাশক জোসেফ পুলিৎজার তার দ্য নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ড পত্রিকার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে অর্থ দেওয়ার আহ্বান জানান। ছোট ছোট অনুদানও প্রকাশ্যে স্বীকৃতি পাওয়ায় সাধারণ নাগরিকেরা প্রকল্পটির অংশ হয়ে ওঠেন (ব্লামবার্গ, ১৯৮৫)।

এদিকে মূর্তিটি ফ্রান্সে খুলে শত শত আলাদা খণ্ডে প্যাক করা হয়। ১৮৮৫ সালে সেগুলো নিউইয়র্কে পৌঁছায় এবং ভিত্তি বা পেডেস্টালের ওপর পুনরায় সংযোজন করা হয়।

৬.০ ১৮৮৬ সালের ঐতিহাসিক উদ্বোধন

স্ট্যাচু অব লিবার্টির ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোর একটি ২৮ অক্টোবর ১৮৮৬

মার্কিন প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড আনুষ্ঠানিকভাবে মূর্তিটির উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে বার্তোলদিসহ ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

খারাপ আবহাওয়া সত্ত্বেও বিপুল মানুষ অনুষ্ঠান দেখতে সমবেত হয়।

তবে সে সময় মূর্তিটি প্রধানত অভিবাসনের প্রতীক ছিল না। এর মূল অর্থ ছিল স্বাধীনতা, প্রজাতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা এবং ফ্রান্স-মার্কিন বন্ধুত্ব (বেরেনসন, ২০১২)।

অভিবাসীদের সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক পরে গড়ে ওঠে।

৭.০ এমা লাজারাস এবং ‘মাদার অব এক্সাইলস’

১৮৮৩ সালে মার্কিন কবি এমা লাজারাস পেডেস্টালের অর্থ সংগ্রহে সহায়তার উদ্দেশ্যে দ্য নিউ কলোসাস নামের সনেটটি লেখেন।

কবিতায় তিনি লেডি লিবার্টিকে ‘মাদার অব এক্সাইলস’ বা নির্বাসিতদের প্রতীকী আশ্রয়দাত্রী হিসেবে উপস্থাপন করেন (মারোম, ২০০০)।

লাজারাস ১৮৮৭ সালে মারা যান। প্রথমদিকে তার কবিতা মূর্তিটির পরিচয়ের কেন্দ্রে ছিল না। কিন্তু ১৯০৩ সালে কবিতাটি লেখা একটি ব্রোঞ্জের ফলক পেডেস্টালের ভেতরে বসানোর পর পরিস্থিতি বদলে যায়।

কাছের এলিস আইল্যান্ড দিয়ে লক্ষ লক্ষ অভিবাসী যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতেন। সমুদ্রপথে নিউইয়র্কে আসার সময় অনেকের চোখে প্রথম বড় মার্কিন দৃশ্যগুলোর একটি ছিল লেডি লিবার্টি। ফলে স্ট্যাচু অব লিবার্টির ইতিহাস ক্রমেই অভিবাসন, নতুন সুযোগ এবং নতুন দেশে অন্তর্ভুক্তির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে (স্নাইডার, ১৯৯৮)।

৮.০ মার্কিন স্মৃতিস্তম্ভ থেকে বৈশ্বিক প্রতীক

বিশ শতকে লেডি লিবার্টির সাংস্কৃতিক গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পায়।

মূর্তিটি ১৯২৪ সালে জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃতি পায় এবং ১৯৫৬ সালে বেডলোস আইল্যান্ডের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে পরিবর্তন করে লিবার্টি আইল্যান্ড করা হয়।

চলচ্চিত্র, পোস্টার, ডাকটিকিট, রাজনৈতিক কার্টুন, বিজ্ঞাপন এবং সামাজিক প্রচারে এর ছবি ছড়িয়ে পড়ে। প্রেক্ষাপটভেদে এটি আমেরিকা, নিউইয়র্ক, গণতন্ত্র, অভিবাসন, প্রতিবাদ কিংবা স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

গবেষকেরা দেখিয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ জনস্মৃতিস্তম্ভ প্রায়ই নির্মাতাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্যের বাইরেও নতুন অর্থ লাভ করে (ব্যাবকক, ১৯৮৭)।

শতবর্ষ উদ্‌যাপনের আগে ১৯৮৬ সালে ব্যাপক সংস্কার সম্পন্ন হয়। তার আগে ১৯৮৪ সালে ইউনেস্কো স্ট্যাচু অব লিবার্টিকে বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে, এর শিল্প, প্রকৌশল ও আন্তর্জাতিক প্রতীকী মূল্যকে স্বীকৃতি দেয় (ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সেন্টার, তারিখ নেই)।

৮.০ আজ স্ট্যাচু অব লিবার্টির অর্থ কী

আধুনিক স্ট্যাচু অব লিবার্টির ইতিহাস শুধু নির্মাণের সাল-তারিখের ধারাবিবরণী নয়; এটি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত ব্যাখ্যারও ইতিহাস।

মশাল বোঝায় আলোকপ্রাপ্তি। রশ্মিযুক্ত মুকুট স্বাধীনতার বিশ্বজনীন আবেদন প্রকাশ করে। ফলক ৪ জুলাই ১৭৭৬ এবং লিখিত রাজনৈতিক নীতির স্মারক। ভাঙা শিকল নিপীড়ন থেকে মুক্তির প্রতীক। আর সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া দেহভঙ্গি বোঝায় অগ্রগতি ও ভবিষ্যতের দিকে যাত্রা

এই প্রতীকগুলো আজও প্রাসঙ্গিক, কারণ স্বাধীনতার অর্থ নিয়ে সমাজে আলোচনা চলমান। নাগরিকত্ব, অভিবাসন, সাম্য, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারবিষয়ক বিতর্কে মূর্তিটি এখনও ব্যবহৃত হয়।

২০১৯ সালে স্ট্যাচু অব লিবার্টি মিউজিয়াম (যেটি স্ট্যাচু অব লিবার্টির ভিত্তি বা পেডেস্টালে অবস্থিত) চালু হওয়ার পর মূর্তিটির মূল মশালসহ এর নির্মাণ, ইতিহাস ও পরিবর্তিত প্রতীকী অর্থ আরও বিস্তৃতভাবে উপস্থাপনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

লেডি লিবার্টির জীবনী মূলত এমন একটি ধারণার ইতিহাস, যা প্রথমে স্মৃতিস্তম্ভ এবং পরে বিশ্বজনীন প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

স্ট্যাচু অব লিবার্টির ইতিহাস শুরু হয়েছিল ফরাসি উদারপন্থী ও দাসপ্রথাবিরোধী চিন্তার পরিবেশে। বার্তোলদির ভাস্কর্য, আইফেল ও অন্য প্রকৌশলীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা, ফ্রান্স-মার্কিন সহযোগিতা এবং সাধারণ মানুষের অর্থসাহায্যের মধ্য দিয়ে সেই ধারণা বাস্তব রূপ পায়।

১৮৮৬ সালের উদ্বোধনের পরও এর অর্থ স্থির থাকেনি। এমা লাজারাসের কবিতা মূর্তিটিকে অভিবাসীদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করে; নতুন দেশে আসা অসংখ্য মানুষ সেই প্রতীকে ব্যক্তিগত আশা খুঁজে পায়। পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এটিকে বৈশ্বিক প্রতীকে পরিণত করে।

এর প্রতিটি অংশ যেন একই গল্প বলে—সাত রশ্মির মুকুট বিশ্বজনীন স্বাধীনতার আলো, মশাল জ্ঞান ও আলোকপ্রাপ্তির প্রতীক, ফলক ৪ জুলাই ১৭৭৬-এর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং ভাঙা শিকল নিপীড়ন থেকে মুক্তির ঘোষণা।

তাই স্ট্যাচু অব লিবার্টির ইতিহাস শুধু তামা, লোহা ও পাথরের কোনো স্থাপত্যের জীবনী নয়। এটি মানুষের তৈরি এমন এক প্রতীকের ইতিহাস, যার মাধ্যমে আজও স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মুক্তি, মানবিক মর্যাদা ও আশার আদর্শ প্রকাশিত হয়।

তথ্যসূত্র

ব্যাবকক, বি. এ. (১৯৮৭) ‘টেকিং লিবার্টিজ, রাইটিং ফ্রম দ্য মার্জিনস, অ্যান্ড ডুইং ইট উইথ আ ডিফারেন্স’, দ্য জার্নাল অব আমেরিকান ফোকলোর, খণ্ড ১০০। উৎস: https://www.jstor.org/stable/540900.

বেরেনসন, ই. (২০১২) দ্য স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আ ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক স্টোরি। নিউ হ্যাভেন: ইয়েল ইউনিভার্সিটি প্রেস। উৎস: https://books.google.com/books?id=EQ27eAFqZ2YC.

ব্লামবার্গ, বি. (১৯৮৫) সেলিব্রেটিং দ্য ইমিগ্র্যান্ট: অ্যান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ হিস্ট্রি অব দ্য স্ট্যাচু অব লিবার্টি ন্যাশনাল মনুমেন্ট, ১৯৫২–১৯৮২। ওয়াশিংটন, ডি.সি.: ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিস। উৎস: https://eric.ed.gov/?id=ED278589.

করবেট, পি. এস., ইয়ানসেন, ভি., লুন্ড, জে. এম., ফানেস্টিল, টি., ওয়াসকিয়েভিচ, এস. এবং ভিকারি, পি. (২০২২) ইউ.এস. হিস্ট্রি। হিউস্টন, টেক্সাস: ওপেনস্ট্যাক্স। উৎস: https://openstax.org/details/books/us-history.

দুরান্তে, ডি. এল. (২০০৭) আউটডোর মনুমেন্টস অব ম্যানহাটান: আ হিস্টোরিক্যাল গাইড। নিউইয়র্ক: নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি প্রেস। উৎস: https://books.google.com/books?id=1nMnB-2HgbwC.

খান, ওয়াই. এস. (২০১০) এনলাইটেনিং দ্য ওয়ার্ল্ড: দ্য ক্রিয়েশন অব দ্য স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ইথাকা, নিউইয়র্ক: কর্নেল ইউনিভার্সিটি প্রেস। উৎস: https://www.degruyter.com/document/doi/10.7591/9780801460210/html.

মারোম, ডি. (২০০০) ‘হু ইজ দ্য “মাদার অব এক্সাইলস”? অ্যান ইনকোয়ারি ইনটু জিউইশ অ্যাসপেক্টস অব এমা লাজারাসেস “দ্য নিউ কলোসাস”’, প্রুফটেক্সটস। উৎস: https://muse.jhu.edu/article/28572.

ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিস (তারিখ নেই) স্ট্যাচু অব লিবার্টি ন্যাশনাল মনুমেন্ট: হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার। ইউ.এস. ডিপার্টমেন্ট অব দ্য ইন্টেরিয়র। উৎস: https://www.nps.gov/stli/learn/historyculture/index.htm.

স্নাইডার, ডি. (১৯৯৮) ‘“আই নো অল অ্যাবাউট এমা লাজারাস”: ন্যাশনালিজম অ্যান্ড ইটস কনট্রাডিকশনস ইন কংগ্রেশনাল রেটোরিক অব ইমিগ্রেশন রেস্ট্রিকশন’, কালচারাল অ্যানথ্রোপলজি। উৎস: https://www.jstor.org/stable/656689.

স্ট্যাচু অব লিবার্টি–এলিস আইল্যান্ড ফাউন্ডেশন (তারিখ নেই) দ্য স্ট্যাচু অব লিবার্টি। উৎস: https://www.statueofliberty.org/statue-of-liberty/

ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সেন্টার (তারিখ নেই) স্ট্যাচু অব লিবার্টি। উৎস: https://whc.unesco.org/en/list/307/.

Have any thoughts?

Share your reaction or leave a quick response — we’d love to hear what you think!

You may also like

Leave a Comment

-
00:00
00:00
Update Required Flash plugin
-
00:00
00:00