বৃদ্ধ বাবা-মায়ের যত্ন: শেষ বিকেলের একটি ফোনকল যেভাবে বদলে দিল মেয়ের জীবন

7 minutes read

. সন্ধ্যার নীরবতায় বেজে ওঠা ফোন

শীতের শেষ বিকেল। পুরোনো দোতলা বাড়িটির পশ্চিমের বারান্দায় বসে আনোয়ার সাহেব দূরের আকাশ দেখছিলেন। পাশের চেয়ারে তাঁর স্ত্রী সালমা বেগমের জন্য রাখা চায়ের কাপটি অনেক আগেই ঠান্ডা হয়ে গেছে। উঠানের আমগাছ থেকে শুকনো পাতা ঝরে পড়ছিল—ঠিক যেন সময় একে একে পুরোনো দিনের পৃষ্ঠা উল্টে দিচ্ছে।

ঘরের ভেতর থেকে সালমা বেগম ডাকলেন, “মেঘলা কি আজ ফোন করবে?”

আনোয়ার সাহেব মৃদু হেসে বললেন, “অফিসে ব্যস্ত আছে নিশ্চয়ই। সময় পেলে করবে।”

কিন্তু তাঁর কণ্ঠে লুকিয়ে থাকা অপেক্ষা গোপন রইল না। জীবনের এই পর্যায়ে এসে তাঁদের চাহিদা খুব সামান্য—একটু কথা, পরিচিত কারও পদশব্দ এবং সন্তানের কাছ থেকে আন্তরিকভাবে জিজ্ঞাসা করা, তোমরা কেমন আছ?”

সেদিনের একটি ফোনকলই মেঘলাকে বুঝিয়েছিল, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের যত্ন কেবল টাকা পাঠানো বা ওষুধ কিনে দেওয়ার নাম নয়। এটি হলো তাঁদের নিঃসঙ্গতার পাশে বসা, একই কথা ধৈর্য ধরে শোনা এবং ব্যস্ত জীবনের মধ্যে তাঁদের জন্য একটু সময় আলাদা করে রাখা।

২.০ শহরের ব্যস্ততায় হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ক

মেঘলা ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করত। সকাল আটটায় বাসা থেকে বের হয়ে ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যেত। অফিসের সভা, যানজট, বাজার এবং নিজের সংসার—সব মিলিয়ে তার দিনগুলো যেন ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে দৌড়ে কাটত।

প্রতি মাসের শুরুতে সে বাবা-মায়ের ব্যাংক হিসাবে টাকা পাঠাত। প্রয়োজনীয় ওষুধ অনলাইনে অর্ডার করে দিত। তার ধারণা ছিল, এটাই যথেষ্ট। সহকর্মীরা বাবা-মায়ের কথা জিজ্ঞাসা করলে সে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলত, “তাঁদের কোনো কিছুর অভাব হতে দিই না।”

অথচ শেষ কবে বাবার পাশে বসে তাঁর পুরোনো দিনের গল্প শুনেছে, তা মেঘলার মনে পড়ত না। শেষ কবে মায়ের হাত ধরে জিজ্ঞাসা করেছে, “রাতে ঘুম হয় তো?”—সেটিও সে বলতে পারত না।

এক সন্ধ্যায় সালমা বেগম ফোন করে একই কথা তিনবার জিজ্ঞাসা করলেন, “তুই আগামী শুক্রবার আসবি তো?”

প্রথমবার মেঘলা বলেছিল, “হ্যাঁ মা, চেষ্টা করব।”

দ্বিতীয়বার তার গলায় বিরক্তি ফুটে উঠল। তৃতীয়বার সে বলে ফেলল, “একই প্রশ্ন বারবার করছ কেন? অফিসে আমার অনেক কাজ!”

ফোনের অন্য পাশে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা ছিল। তারপর মা ধীরে বললেন, “ঠিক আছে মা, কাজ কর।”

ফোন রেখে মেঘলা আবার কম্পিউটারের পর্দায় তাকাল। কিন্তু মায়ের সেই শান্ত কণ্ঠটি তার মনের ভেতর আটকে রইল।

. বৃদ্ধ বাবা-মায়ের যত্ন নিয়ে অপ্রত্যাশিত শিক্ষা

পরদিন অফিস থেকে ফেরার পথে মেঘলার কাছে প্রতিবেশী রাশেদ চাচার ফোন এল। তিনি জানালেন, আনোয়ার সাহেব বাজারে গিয়ে বাড়ির রাস্তা মনে করতে পারছিলেন না। পরিচিত এক দোকানদার তাঁকে চিনতে পেরে বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছেন।

খবরটি শুনে মেঘলার বুক কেঁপে উঠল।

সে সেই রাতেই গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলো। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বাড়িতে পৌঁছাতে প্রায় মধ্যরাত। দরজা খুললেন সালমা বেগম। মেয়েকে দেখে তাঁর ক্লান্ত মুখটি মুহূর্তে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

“এত রাতে এলি? আগে জানাসনি কেন?”

মেঘলা মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “তোমাদের দেখতে ইচ্ছে করছিল।”

আনোয়ার সাহেব তখন ঘুমাচ্ছিলেন। তাঁর বিছানার পাশের টেবিলে মোটা ফ্রেমের চশমা, কয়েকটি ওষুধ এবং একটি ছোট নোটবুক রাখা ছিল। নোটবুকটির প্রথম পাতায় বড় অক্ষরে লেখা—

যা ভুলে যাই, এখানে লিখে রাখি।”

পরের পাতাগুলোয় বাজারের তালিকা, ওষুধ খাওয়ার সময় এবং পরিচিত মানুষের ফোন নম্বর লেখা। একটি পাতায় ছিল মেঘলার নাম ও নম্বর। তার নিচে লেখা—

মেঘলা ব্যস্ত থাকে। খুব প্রয়োজন না হলে ফোন করব না।”

কথাটি পড়ে মেঘলার চোখ ভিজে উঠল। এত দিন সে ভেবেছিল, অর্থনৈতিক সহায়তার মাধ্যমেই বৃদ্ধ বাবা-মায়ের যত্ন নিশ্চিত করছে। অথচ বাবা নিজের অসুবিধার কথা বলতেও সংকোচ বোধ করছিলেন, যেন সন্তানের কাছে তিনি বোঝা হয়ে গেছেন।

.পুরোনো অ্যালবামে ফিরে পাওয়া শৈশব

পরদিন সকালে বাবা বেশ স্বাভাবিক ছিলেন। তিনি আগের দিনের ঘটনা ঠিকভাবে মনে করতে পারলেন না। নাশতার পর সালমা বেগম পুরোনো একটি ছবির অ্যালবাম বের করলেন।

একটি ছবিতে দেখা গেল, ছোট্ট মেঘলা বাবার কাঁধে বসে আছে। আরেকটি ছবিতে মা তাকে ভাত খাওয়াচ্ছেন। মেঘলা হেসে বলল, “আমি কি খুব দুষ্টু ছিলাম?”

বাবা বললেন, “তুই এক প্রশ্ন শতবার করতি। রাস্তায় কিছু দেখলেই জানতে চাইতি—ওটা কী, কেন হয়, কোথায় যায়। উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত থামতি না।”

“তোমরা বিরক্ত হতে না?”

আনোয়ার সাহেব মেয়ের দিকে অবাক হয়ে তাকালেন। “সন্তানের প্রশ্নে বাবা-মা বিরক্ত হয় নাকি?”

সহজ উত্তরটি মেঘলার হৃদয়ে গভীরভাবে আঘাত করল। ছোটবেলায় তার অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর যাঁরা ধৈর্য ধরে দিয়েছেন, আজ তাঁদের একটি কথা দ্বিতীয়বার শুনতেই সে অস্থির হয়ে ওঠে!

সে বুঝল, বয়স মানুষের হাঁটার গতি কমিয়ে দেয়, স্মৃতিকে দুর্বল করে এবং পরিচিত কাজকেও কঠিন করে তোলে। কিন্তু সম্মান পাওয়ার অধিকার কখনো কমিয়ে দেয় না।

.বৃদ্ধ বাবা-মায়ের যত্নে ছোট ছোট পরিবর্তন

মেঘলা চাকরি ছেড়ে দিল না, কিংবা রাতারাতি নিজের পুরো জীবন বদলে ফেলল না। পরিবর্তে সে একটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করল। কারণ বৃদ্ধ বাবা-মায়ের যত্ন আবেগের পাশাপাশি নিয়মিত ব্যবস্থা ও পরিবারের সহযোগিতাও দাবি করে।

প্রথমে সে বাবাকে একজন চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেল। চিকিৎসক পরীক্ষা করে বললেন, বয়সের কারণে তাঁর স্মৃতিতে কিছু সমস্যা দেখা দিচ্ছে। নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, সঠিক সময়ে ওষুধ এবং পরিচিত মানুষের সঙ্গ তাঁকে নিরাপদ রাখতে সাহায্য করবে।

মেঘলা বাড়ির একটি বোর্ডে জরুরি নম্বরগুলো বড় করে লিখে দিল। ওষুধ রাখার বাক্সে সকাল, দুপুর ও রাতের আলাদা চিহ্ন বসাল। বাজারে গেলে বাবা যেন পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখেন, সেই ব্যবস্থাও করল।

কিন্তু সে বুঝেছিল, শুধু নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। তাই প্রতিদিন রাত নয়টায় বাবা-মায়ের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলার সিদ্ধান্ত নিল। সপ্তাহে এক দিন কোনো তাড়া ছাড়াই তাঁদের গল্প শুনত। প্রতি মাসে অন্তত দুবার বাড়িতে আসার সময়ও ঠিক করল।

যেমন, মা যদি একই ঘটনা কয়েকবার বলতেন, মেঘলা আর তাঁকে থামিয়ে দিত না। মন দিয়ে শুনে বলত, “তারপর কী হলো?” বাবা কোনো পরিচিত শব্দ ভুলে গেলে সে উত্তর দেওয়ার জন্য তাঁকে সময় দিত। এসব ছিল খুব ছোট কাজ, কিন্তু বৃদ্ধ বাবা-মায়ের যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে ছোট কাজই অনেক সময় সবচেয়ে বড় ভালোবাসায় পরিণত হয়।

. পরিবারের অন্যদেরও এগিয়ে আসা

একদিন মেঘলা তার ভাই রায়হানকে ফোন করল। রায়হান বিদেশে থাকত এবং নিয়মিত টাকা পাঠালেও বাবা-মায়ের সঙ্গে খুব কম কথা বলত।

মেঘলা তাকে দোষারোপ না করে বলল, “আমরা দুজনেই ভাবছি টাকা পাঠালেই দায়িত্ব শেষ। কিন্তু বাবা-মা আসলে আমাদের কণ্ঠ শুনতে চান।”

কথাটি রায়হানকে ভাবিয়ে তুলল। এরপর সে প্রতি রোববার বাবার সঙ্গে ভিডিও কলে দাবার চাল নিয়ে আলোচনা করত। উৎসবের সময় শুধু উপহার না পাঠিয়ে ছুটি নিয়ে বাড়িতে আসত। পরিবারের ছোট নাতি-নাতনিরাও দাদা-দাদির কাছ থেকে গল্প শোনার অভ্যাস গড়ে তুলল।

মেঘলা প্রতিবেশী রাশেদ চাচা ও পাশের বাড়ির রুবিনা খালার নম্বর সংরক্ষণ করল। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত যোগাযোগের জন্য একটি ছোট সহায়তা-বলয় তৈরি হলো। এই বাস্তব উদাহরণটি দেখিয়ে দিল, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের যত্ন শুধু একজন সন্তানের কাজ হিসেবে না দেখে ভাইবোন, আত্মীয় ও বিশ্বস্ত প্রতিবেশীদের সমন্বিত উদ্যোগ হিসেবে নিলে তা অনেক সহজ হয়।

. সম্মান—যত্নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ

সময়ের সঙ্গে আনোয়ার সাহেবের ভুলে যাওয়ার প্রবণতা কিছুটা বাড়ল। কখনো তিনি চশমা কোথায় রেখেছেন ভুলে যেতেন, কখনো সকালের ঘটনা বিকেলে আবার বলতেন। মেঘলা অবশ্য তাঁর সামনে তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করত না।

কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সে বাবা-মায়ের মতামত চাইত। ঘরের কোন অংশ মেরামত করা হবে, উৎসবে কারা আসবে কিংবা চিকিৎসকের কাছে কখন যাওয়া সুবিধাজনক—এসব বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করত।

কারণ বৃদ্ধ বাবা-মায়ের যত্ন মানে তাঁদের হয়ে সব সিদ্ধান্ত নিয়ে নেওয়া নয়। বরং যত দূর সম্ভব তাঁদের স্বাধীনতা, মতামত ও ব্যক্তিগত মর্যাদা রক্ষা করা।

একদিন আনোয়ার সাহেব বললেন, “বয়স হয়েছে বলে সবাই যদি মনে করে আমি কিছুই বুঝি না, তখন খুব কষ্ট হয়।”

মেঘলা বাবার হাত ধরে বলল, “তোমার হাঁটার গতি কমেছে, তোমার গুরুত্ব নয়।”

বাবা কিছু বললেন না। কেবল তাঁর মুখে শান্ত একটি হাসি ফুটে উঠল।

.শেষ বিকেলের নতুন আলো

কয়েক মাস পর আবার শীত এল। সেই একই বারান্দা, একই আমগাছ এবং বিকেলের নরম আলো। তবে এবার বারান্দাটি নীরব ছিল না।

আনোয়ার সাহেব নাতনিকে পুরোনো দিনের গল্প শোনাচ্ছিলেন। সালমা বেগম মেঘলাকে রান্নাঘরের একটি পরিচিত খাবারের রেসিপি শেখাচ্ছিলেন। রায়হান ভিডিও কলে সবার সঙ্গে কথা বলছিল। বাড়ির বাতাসে আবার প্রাণ ফিরে এসেছিল।

হঠাৎ আনোয়ার সাহেব মেঘলাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুই কবে এলি?”

মেঘলা হাসল। “গতকাল এসেছি, বাবা।”

কয়েক মিনিট পর বাবা আবার একই প্রশ্ন করলেন।

এবার মেঘলার কণ্ঠে কোনো বিরক্তি ছিল না। সে বাবার পাশে গিয়ে বসল এবং আগের মতোই শান্তভাবে উত্তর দিল, “গতকাল এসেছি। আরও তিন দিন তোমাদের সঙ্গে থাকব।”

আনোয়ার সাহেব নিশ্চিন্ত হয়ে মাথা নাড়লেন। কিছুক্ষণ পর হয়তো তিনি উত্তরটি আবার ভুলে যাবেন। কিন্তু মেঘলা জানত, মানুষ অনেক কথা ভুলে গেলেও আচরণ থেকে পাওয়া অনুভূতি সহজে হারায় না।

.ভালোবাসা ফিরিয়ে দেওয়ার সময়

বাবা-মা সন্তানের প্রথম হাঁটা, প্রথম কথা এবং অসংখ্য ভুল ধৈর্যের সঙ্গে গ্রহণ করেন। একসময় বয়সের ভারে তাঁদেরও সাহায্য, নিরাপত্তা ও পুনরাবৃত্ত আশ্বাসের প্রয়োজন হয়। তখন বিরক্তি নয়, তাঁদের প্রাপ্য হলো সেই পরিচিত ধৈর্য ও মমতা।

বৃদ্ধ বাবা-মায়ের যত্ন কোনো বিশেষ দিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি প্রতিদিনের একটি ফোনকল, চিকিৎসার খোঁজ রাখা, একই গল্প আবার শোনা, তাঁদের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেওয়া এবং ব্যস্ততার মাঝেও পাশে থাকার নাম।

মেঘলা শেষ পর্যন্ত বুঝেছিল, বড় উপহার কিংবা প্রচুর অর্থ সব শূন্যতা পূরণ করতে পারে না। কখনো কখনো বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয় সন্তানের পাশে বসে বলা একটি ছোট বাক্য—

তোমরা বোঝা নও। তোমরাই আমাদের শিকড়, আর তোমাদের পাশে আমরা আছি।”

Have any thoughts?

Share your reaction or leave a quick response — we’d love to hear what you think!

You may also like

-
00:00
00:00
Update Required Flash plugin
-
00:00
00:00